মাগুরা প্রতিদিন : মাগুরার শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে কিছু মানুষের নাম সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তারা শুধু শিক্ষক নন, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা নন—তারা হয়ে ওঠেন একটি জেলার বিবেক ও আলোকবর্তিকা। বরেণ্য শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক ও সমাজসংস্কারক খান জিয়াউল হক তেমনই একজন মানুষ, যার নাম ছাড়া মাগুরার আধুনিক শিক্ষার ইতিহাস পূর্ণতা পায় না।
১৯২৭ সালে মাগুরা সদর উপজেলার ভায়না গ্রামে এক বর্ধিষ্ণু ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন খান জিয়াউল হক। বাবার চাকরিসূত্রে তৎকালীন দুই বাংলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ পান তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন প্রগতিশীল ও সচেতন।
১৯৫০ সালে যশোর এমএম কলেজের সভাপতি থাকাকালীন তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালে যশোর এলাকায় ভাষা আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে অবস্থান নিয়ে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৫৩ সালে মাগুরা রামনগর হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তার পেশাগত জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত হলেও মাগুরার মাটির টান তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে শিক্ষকতায়। তার স্বপ্ন ছিল একটাই—নিজের জন্মভূমির শিক্ষাঙ্গনকে আধুনিক, মানবিক ও সর্বজনীন করে তোলা। ১৯৫৪ সালে তিনি মাগুরা আব্দুল গণি হাই মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৫৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫৭ সালে মাগুরা মডেল স্কুলে (বর্তমান মাগুরা সরকারি বালক বিদ্যালয়) সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু সরকারি চাকরির নিরাপত্তা তার কাছে মুখ্য ছিল না; শিক্ষা নিয়ে নতুন কিছু গড়ার তাগিদই ছিল তার চালিকাশক্তি।
১৯৬২ সালে তৎকালীন মাগুরার বিশিষ্টজনদের অনুরোধে তিনি মডেল স্কুলের চাকরি ছেড়ে মাগুরা আব্দুল গণি হাই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। তার দক্ষ নেতৃত্ব ও দূরদর্শী পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে মাগুরা এজি একাডেমি নামে পরিচিত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এজি একাডেমি জেলার শিক্ষাঙ্গনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হতে থাকে এবং মহাকুমা পর্যায়ের নানা শিক্ষামূলক কর্মসূচি, প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান।
নারী শিক্ষার প্রসারে খান জিয়াউল হকের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। মাগুরা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে আসন সংরক্ষিত থাকায় বহু সাধারণ ছাত্রী মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এই বাস্তবতা তাকে নাড়া দেয় গভীরভাবে।
১৯৭৮ সালের দিকে স্থানীয় গণ্যমান্যদের নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন এজি একাডেমির সহায়তায় একটি আলাদা বালিকা বিদ্যালয় চালুর। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় মাগুরা দুধ মল্লিক বালিকা বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন স্কুলটির সঙ্গে যুক্ত থেকে একে জেলার অন্যতম শক্তিশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরবর্তীতে মাগুরা এ এন গার্লস স্কুল ও মাগুরা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়—এই বিশ্বাস থেকে তিনি আজীবন কাজ করেছেন বই, পাঠাগার ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বিস্তারে। ১৯৬৬ সালে তিনি মাগুরা সৈয়দ আতর আলী পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং টানা ৪৪ বছর দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে তার উদ্যোগে চালু হওয়া ‘বই বাক্স কর্মসূচি’—টিনের বাক্সে বই ভরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা—সেই সময় ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয় গ্রামবাংলার শিক্ষার্থীদের কাছে। তার উদ্যোগেই শহীদ সৈয়দ আতর আলী গণগ্রন্থাগার ও এজি একাডেমির মধ্যবর্তী স্থানে নির্মিত হয় তিন নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে দীর্ঘদিন তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও খান জিয়াউল হকের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। মাগুরা সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে আসন সীমিত হওয়ায় বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে পারছিল না—এই সংকট সমাধানে ১৯৮৪ সালে তার তত্ত্বাবধানে এজি একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় মাগুরা আদর্শ কলেজ। পরবর্তীতে কলেজটি নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হলেও এর জন্ম ও বিকাশ ছিল খান জিয়াউল হকের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। নারী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ১৯৮৭ সালে তিনি জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র কলেজ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন, যেখানে তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯২ সালে শিক্ষা বিস্তারের আরেকটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয় তার হাত ধরে। কুন্ডেশ্বরী ঔষাধালয়ের মালিক শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের পুত্র প্রফুল্ল চন্দ্র সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কবিরাজ তপন কুমার বসুর সহযোগিতায় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে গড়ে তোলেন প্রফুল্ল চন্দ্র আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম বৃহৎ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হিসেবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষার পাশাপাশি চরিত্র গঠনের ওপরও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। মাগুরা স্কাউট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি জেলার প্রায় সব স্কুলে স্কাউটিং কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন। তার প্রচেষ্টায় মাগুরা এজি একাডেমি শিশু-কিশোরদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের সূতিকাগারে পরিণত হয়—যেখানে রেডক্রিসেন্ট, শিশু বিষয়ক প্রতিযোগিতা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচিসহ নানা কার্যক্রম নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে খান জিয়াউল হক মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে বাংলাদেশ স্কাউটসের সর্বোচ্চ সম্মান ‘রৌপ্য ব্যাঘ্র’, আব্দুল হক গোল্ড মেডেল, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের পুরস্কারসহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি এই মহান শিক্ষাবিদ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন মাগুরার শিক্ষাঙ্গনে এক স্থায়ী ছাপ। আজও জেলার অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আলোকিত শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকের মধ্যে বেঁচে আছেন তিনি—মাগুরার শিক্ষাঙ্গনের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে।